শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ০৭:১৫ অপরাহ্ন

ফরিদপুরে অস্ত্র-গুলি-মাদক-সরকারি চালসহ গ্রেফতার হয়েছে প্রভাবশালী সহোদর

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট টাইম সোমবার, ৮ জুন, ২০২০
  • ২৬৫ জন সংবাদটি পড়েছেন

অবশেষে গ্রেফতার হয়েছে ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। রোববার রাতে অস্ত্র-গুলি মাদক ও নগদ টাকা, সরকারি চালসহ তাদের গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলা ও ভাংচুরের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে সোমবার দুপুরে ফরিদপুর জেলার পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।

সামান্য পরিবহন চাঁদাবাজ থেকে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছে ফরিদপুরের সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। একসময় যাদের ব্যাংকে লাখ টাকাও ছিল না, তারা এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। ফরিদপুর শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিনেছেন কয়েক শ একর সম্পত্তি। ঢাকা-ফরিদপুর রুটে নামিয়েছেন শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। ঢাকার অভিজাত এলাকায় বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন ।

আটক বরকত ও রুবেল সম্পর্কে আপন দুই ভাই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খোকন রাজাকারের আপন ভাগ্নে এ দুই ভাই। তাদের গ্রেপ্তারের খবরে জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাজ্জাদ হোসেন বরকত ফরিদপুর জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি। বরকত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আর তার ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেল ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক ভোরের প্রত্যাশা নামক পত্রিকার সম্পাদক। অর্থ আর সম্পদের লোভে এক সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়ান এ দুই ভাই। পরে ক্ষমতা বদলের পর তারাও রূপ বদলান। রাজনীতিকে ব্যবহার করে ত্রাস হয়ে ওঠেন ফরিদপুরের। তাদের দাপটে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এখন কোনঠাসা। কেউ কেউ অপমানে, অভিমানে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন।

বরকত ও রুবেলের বাবা আবদুস সালাম মন্ডল ছিলেন বিএডিসির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। অভাবের সংসারের কারণে পড়ালেখা বেশিদূর করতে পারেননি তারা। এরশাদের জমানায় ফরিদপুর শহরের রাজবাড়ী মোড়ে পরিবহনে চাঁদা উঠাতেন দুই ভাই। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে পরিচয় হয় স্থানীয় বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে। এরপর থেকে ওই নেতার ঘনিষ্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই সময় কোমরপুর এলাকার জাকির নামের এক যুবকের দুই হাত কেটে প্রথম আলোচনায় আসেন দুই ভাই। পরে ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এডভোকেট মহিউদ্দিন খোকনকে হত্যার অভিযোগ উঠে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। মামলা হয় তাদের বিরুদ্ধে। আসামি করা হয় ১ ও ৩ নম্বর। এরপর গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দেন তারা। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিহত খোকনের বাড়িতে যান সমবেদনা জানাতে। অভিযোগ রয়েছে অদৃশ্য ইশারায় পার পেয়ে যান এই দুই ভাই। হত্যা মামলার রায়েও খালাস পান তারা। ফের প্রকাশ্যে এসে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ক্ষমতার পালা বদলে তারা ভিড়েন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। সান্নিধ্যে আসেন ফরিদপুর আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার। এরপরই ভাগ্য খুলে যায় দুই ভাইয়ের। জড়িয়ে পড়েন টেন্ডারবাজিতে।

স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৯ বছরে ফরিদপুর শহরে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল-দারিত্ব ও মাদকবাণিজ্যের জাল ছড়িয়েছে দুই ভাই বরকত ও রুবেল। এসব অপকর্ম করে দেশে-বিদেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন তারা। তাদের জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে প্রায় ৬৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। পরে এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি।

ফরিদপুর পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, গত ১৬ মে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মারধরের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের বদরপুর মোড় হতে প্রথমে বরকত, রুবেল ও বিপুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের জব্দকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি পিস্তল ও ৯১ রাউন্ড গুলি, দুইটি শর্টগান ও ১৮০টি কার্তুজ, ব্রান্ডের ছয় বোতল বিদেশি মদ, ৬৫ পিস ইয়াবা, খাদ্য অধিদপ্তরের এক হাজার ২০০ বস্তায় ৬০ হাজার কেজি চাল, তিন হাজার ইউএস ডলার, ৯৮ হাজার ভারতীয় রুপি ও বাংলাদেশি ২৯ লাখ টাকা। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন- সহযোগী রেজাউল করিম বিপুল, আওয়ামী লীগ নেত্রী ইয়াসমিন সুলতানা বন্যা মন্ডল, ছাত্রলীগ নেতা এনামুল ইসলাম জনি, অমিয় সরকার, বর্ধিত ১৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চক্রবর্তী, সাবেক ৬নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর মাহফুজুর রহমান মামুন ও জাহিদ খান।

পুলিশ সুপার জানান, বরকত ও রুবেলের কোমর হতে গুলিভর্তি ম্যাগজিনসহ সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ বোরের পিস্তল জব্দ করা হয়। এছাড়া বরকতের রেস্ট হাউস হতে বিদেশি মদ ও খাদ্য অধিদপ্তরের এক হাজার ২০০ বস্তাভর্তি চাল এবং রুবেলের ড্রয়ার হতে ৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।

আলিমুজ্জামান জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও সরকারি চাল গুদামজাত করার অপরাধে নিয়মিত মামলা হবে। তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ আরও বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলকে গ্রেপ্তারের খবরে তাদের বিচার ও শাস্তি দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের একাংশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন : ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরনের আরো সংবাদ

আমাদের রূপসী ইউটিউব চ্যানেল

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: রবিউল ইসলাম তোতা

প্রধান কার্য্যালয় : রামনগর পূর্ব রূপসা, রূপসা, খুলনা

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া কপি রাইট বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Hwowlljksf788wf-Iu