শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম

বাঘের খপ্পরে দুই স্বামী হারানো বাঘ বিধবা সোনামনি এখনো তাকিয়ে থাকে সুন্দরবনের দিকে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট টাইম বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ২০২১
  • ১০১ জন সংবাদটি পড়েছেন
রাকিবুল হাসান শ‍্যামনগরঃবাঘ বিধবা সোনামণি ছোট বেলায় বাবার বাড়ি সাতক্ষীরার কালিগন্জ উপজেলায় বড় হয়। সংসারের অভাবের কারণে বেশি দিন বাবার ঘরে থাকতে পারেনি।অল্প বয়সে তাকে ছাড়তে হয় বাবার বাড়ি।
১৫ বছর বয়সে সোনামণির বাবা তাকে বিয়ে দেয় নিজ বংশীয় জেলে সম্প্রদায়ের সাথে। ভাল ছেলে হওয়ায় হাত ছাড়া করেনি সোনামনির বাবা। বিয়ে দিয়ে দেয় শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ গ্রামের জেলে পাড়ার রাধাকান্ত সরদারের সাথে। মা বাবা ভালবেসে আদরের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে একটু শান্তি চেয়েছিলেন।বিয়ের পর পরই সোনামনির কোল আলো করে জন্ম নেয় এক ছেলে সন্তানের। সোনামনির মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
বেশ ভালই চলছিল সোনামনির স্বামী সংসার। জেলে পরিবার হওয়া স্বামীর পেশা ছিল সুন্দরবনে মাছ ধরা। কিন্তু বিধির বিধানে ১৯৯৯ সালে তার স্বামী রাধাকান্ত সরদার সুন্দরবনে মাছ ধরতে গেলে বাঘের কবলে পড়ে আর জীবিত ফিরে আসেনি। বাঘের কবল থেকে তার স্বামীর লাশ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি সঙ্গিরা। সেই আক্ষেপ নিয়ে  আকাশ ভেঙে পড়ে সোনামনির মাথায়। সুখের সংসার তছনছ হয়ে যায়।সোনামনি কিভাবে সংসার চালাবে তা ভেবে পায়না। সে সময় স্বামী হারা একজন নারীকে সমাজে অবহেলার চোখে দেখা হত। দেবরের সংসারে থাকতে অনেক গুঞ্জন শুনতে হয়েছে।
সোনামণির বাবার সংসারে অভাব ছিল যে কারণে সংসারে জায়গা হয়নি। কাজ না করলে তার ভরন পোষণের দায়িত্ব বা কে নেবে। পাড়া পড়শিরা অপয়া, স্বামী খেকো, অলক্ষী বলে ধিক্কার দিতে থাকে। এক পর্যায়ে পাড়া প্রতিবেশিরা অবিবাহিত দেবর ভবেন সরদারের সাথে সোনামনির ২য় বিয়ে দিয়ে দেয়। ভবেন সরদারও সুন্দরবনে মাছ ধরে সংসার চালান। সোনামনির দু:খ কিছুটা লাঘব হয়। পিছনের কালো অধ্যায় মুছে ফেলে নতুন ভাবে স্বামী সংসার শুরু করে সোনামনি। এরই মধ্যে কোল আলো করে ফুট ফুটে এক ছেলে ও দুই মেয়ে সন্তানের জম্ম হয়। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে দুঃখের সংসারে দিন অতিবাহিত করতে থাকে সোনামনি।
২০০৯ সালে আইলার পরপরই ভবেন সরদার বনে মাছ ধরার জন্য গেলে বাঘের আক্রমনে মারা যান।প্রথম স্বামীর মত লাশ  ফিরিয়ে আনতে পারিনি সঙ্গীরা।
বাঘে ধরা অনেকের লাশ বাড়িতে ফিরিয়ে আনে কিন্তু বিধাতার কি করুন পরিনতি সোনামণির দুইটা স্বামীর লাশ পর্যন্ত দেখতে না পেয়ে আক্ষেপে ফেটে পড়েন। সোনামনির মাথায় আবারও আকাশ ভেঙে পড়ে। ২য় স্বামী বাঘে নিয়ে যাওয়ার পর সোনামণির আর জায়গা হয়নি শ্বশুর বাড়িতে।
নিরুপায় হয়ে ছেলে মেয়েদের বাঁচানোর জন্য জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েন সোনামণি।লোকের বাড়িতে দিন মজুরি, মাছ ধরা সহ বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালান।
ছেলে মেয়েরা বড় হতে থাকে। নিজের সংগ্রামী করে রোজগার করা অর্থ দিয়ে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।
দুই ছেলে নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল সুখী হওয়ার। কিন্তু ছেলেরা বড় হলেই বিয়ে দিয়ে বৌমা আনেন সোনামনি। তাদের সংসারে বনিবনা না হতেই দু:খের সংসারে পৃথক করে দেওয়া হয় মা সোনামনিকে। জাগয়া জমি বলতে ঘরের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া কিছু নেই।
এই পরিস্থিতে সোনামনি বিভিন্ন কাজ করে নিজের সংসার অতিবাহিত করেন।ছেলে মেয়েদের নিয়ে সুখের স্বপ্ন দেখলেও সে সুখ ভোগ করতে পারিনি।
সোনামনি বেসরকারি সংস্থা লিডার্স এর বাঘ বিধবা দলের একজন সদস্য হন।সেখান থেকে কিছু সহযোগিতা পেয়ে থাকেন।
বাঘ বিধবা সোনামণি জানান, আমার দুই স্বামীর লাশ পর্যন্ত ফিরে না পাওয়ায়। ২২টা বছর প্রতিদিন অবসার সময় সুন্দরবনের পাশে যেয়ে বসে অপেক্ষা করি। দু ছোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকি যে আমার সন্তানদের বাবারা কবে  ফিরে আসবে সেই আশায়। বর্তমানে সোনামণি নিজের  জীবন চলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
করোনার রেশ কাটতে না কাটতেই আম্ফানের আঘাত। আম্ফানের আঘাতে উপক‚লীয় এলাকা তছনছ হয়ে যায়। সোনামনি এখন হতাশ হয়ে দিন গুনছেন কবে করোনা যাবে। কাজ করে নিজের পেটের ভাত জোগাড় করতে পারবে।

দু:খের সংসারে করোনা ও আম্ফানের কারনে আজ তার বেঁচে থাকা দায়। কি করবে ভেবে পায়না সে। করোনা ও আম্ফানের থাবায় সোনামনির মত সব বাঘ বিধবাদের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন : ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ ধরনের আরো সংবাদ

আমাদের রূপসী ইউটিউব চ্যানেল

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: রবিউল ইসলাম তোতা

প্রধান কার্য্যালয় : রামনগর পূর্ব রূপসা, রূপসা, খুলনা

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া কপি রাইট বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Hwowlljksf788wf-Iu