- by Editor
- Jan, 03, 2025 07:14
নিজস্ব প্রতিবেদক: খুলনার ভোরটা ছিল অন্য দিনের মতোই নীরব—কিন্তু সেই নীরবতার ভেতর লুকিয়ে ছিল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। দায়িত্বে থাকা এক তরুণ পুলিশ সদস্যের জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হলো নিজের হাতেই, নিজের অস্ত্রের গুলিতে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভোরে খুলনা রেলওয়ে জেলা পুলিশ কার্যালয়ের অস্ত্রাগারে কর্তব্যরত অবস্থায় নিজের ইস্যুকৃত রাইফেল দিয়ে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন কনস্টেবল সম্রাট বিশ্বাস। সহকর্মীরা যখন ছুটে আসেন, ততক্ষণে সব শেষ। কর্মস্থলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে মানুষটি দেশের সেবা করছিলেন, সেই তিনিই শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের যন্ত্রণার কাছে হার মানলেন।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চরপদ্মবিলা গ্রামের ছেলে সম্রাট ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। ২০১৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়ার পর স্বপ্ন ছিল পরিবারকে সুখে রাখা, ভবিষ্যৎ গড়া। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই যেন জমে ওঠে অশান্তির কালো মেঘ।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেম করে ছয় মাস আগে বিয়ে করেন সাতক্ষীরা জেলা পুলিশে কর্মরত নারী কনস্টেবল পুঁজা দাসকে। সামনে ছিল আনুষ্ঠানিক বিয়ের আয়োজন—নতুন জীবনের আরেকটি সুন্দর শুরু। কিন্তু বাস্তবতা হয়ে ওঠে ভিন্ন। বিয়ের পর থেকেই দাম্পত্য জীবনে শুরু হয় টানাপোড়েন, প্রতিদিনের ঝগড়া-বিবাদ যেন ক্রমেই বাড়িয়ে তোলে মানসিক চাপ।
সম্রাটের মামা জানান, বিয়ের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তার। উপার্জনের টাকাও নাকি পুরোটা চলে যেত স্ত্রীর কাছে। সহকর্মীদের কাছ থেকেও জানা গেছে, প্রায়ই তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হতো। আর সেই চাপই ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল তরুণ এই পুলিশ সদস্যকে।
ঘটনার আগের রাতেও স্ত্রীর সঙ্গে তীব্র রাগারাগি হয় সম্রাটের। হয়তো সেই রাতেই চূড়ান্ত ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। ভোরের আলো ফোটার আগেই নীরবে নিভে যায় একটি জীবন, থেমে যায় এক পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক কলহ ও মানসিক হতাশা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
এই মৃত্যু শুধু একটি আত্মহত্যার ঘটনা নয়—এটি আমাদের চারপাশে নীরবে বেড়ে ওঠা মানসিক সংকটের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। দায়িত্ব, সম্পর্ক, প্রত্যাশা আর না বলা কষ্টের ভার—সব মিলিয়ে যখন একজন মানুষ ভেঙে পড়ে, তখন তার আর্তনাদ অনেক সময় আমাদের কানে পৌঁছায় না।
সম্রাট বিশ্বাসের নিথর দেহ আজ শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি সত্যিই আমাদের কাছের মানুষের ভেতরের কষ্টগুলো বুঝতে পারছি? নাকি তারা নীরবেই হারিয়ে যাচ্ছে, আমাদের অজান্তে…?