- by Editor
- Jan, 15, 2025 07:21
সোনালী ডেক্স: ভোরে রূপসা নদীর ঘাটে দাঁড়ালে একটা কোলাহল শোনা যায়—ইঞ্জিনের গর্জন, যাত্রীদের চিৎকার, ট্রলারের বাঁশের ঠকঠক আওয়াজ। প্রতিদিন এই শব্দগুলোই খুলনার হাজারো মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
একজন সুশৃঙ্খল জীবনের শান্তি প্রিয় মানুষ মাসুম বিল্লাহ বলেন, এই রূপসাঘাট দিয়েই প্রতিদিন পার হই—ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাই, আবার বিকেলে ফিরি।
কিন্তু এখন এই ঘাট আমার কাছে আর শুধু নদীপথ নয়—এ এক ভয়াবহ স্মৃতি, এক অবিরাম আতঙ্কের নাম।
সেদিন রাতটা এখনো চোখে ভাসে।
আকাশে হালকা কুয়াশা, নদীতে ঢেউ। ট্রলারে তখন যাত্রীতে ঠাসা। সবাই তাড়াহুড়ো করছে—কারও কাজে দেরি হবে, কেউ ঘরে ফিরবে। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ দেখি ট্রলারটি পল্টুনে জোরে ধাক্কা খেল!
এক মুহূর্তেই চিৎকার আর বিশৃঙ্খলা। কয়েকজন যাত্রী নদীতে পড়ে গেল। কারও হাতে ব্যাগ, কারও কোলের বাচ্চা, কেউ সাঁতার জানে না। কেউ চিৎকার করছে “বাঁচাও!”, কেউ হাত ছুঁড়ে ধরার চেষ্টা করছে কিছু একটা।
আর তাদের মধ্যেই ছিল আমার চেনাজানা মানুষ—মিঠুন।
মিঠুন, যার মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকত, যিনি প্রতিদিন ট্রলারেই কাজে যেতেন।
সে দিনও গিয়েছিল। কিন্তু মাঝনদীতে বসে থাকা মানুষটিই জানত না—আজ তার জন্য ট্রলারচালক লিখে রাখছে এক নির্মম মৃত্যুর গল্প।
কেউ একজন বলল, “একটা দড়ি দাও!”
কেউ বলল, “ইঞ্জিন বন্ধ করো!”
কিন্তু মাঝিরা যেন কিছুই শুনছিল না।
সব মিলিয়ে রূপসার বুকজুড়ে সৃষ্টি হলো এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।
তারপর সব থেমে গেল।
নদী তার বুকের ভেতর মিঠুনকে লুকিয়ে নিল।
যেন কিছুই ঘটেনি।
শুধু ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো বোবা হয়ে গেল, আর মিঠুনের স্ত্রী নদীর পাড়ে বসে কাঁদছিল নির্বাক।
আমি তাকিয়ে ছিলাম। আমার ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল।
ভাবছিলাম—এই ঘাট দিয়ে আমিও তো প্রতিদিন পার হই, আমার ছেলেকে নিয়ে। যদি সেদিন আমরা উঠতাম সেই ট্রলারে?
এই ঘাটে কোনো নিয়ম নেই, নেই নিরাপত্তা। মাঝিরা যেভাবে খুশি ট্রলার চালায়, যাত্রী তোলা-নামানোর সময় কোনো শৃঙ্খলা নেই। যারা একটু কিছু বলতে যায়, তাদের অপমান করা হয়, ভয় দেখানো হয়। অনেক সময় তো মারধরও করে।
আমরা সাধারণ মানুষ কেবল নীরব দর্শক।
রূপসা নদী এখন যেন মৃত্যুর ফাঁদ।
প্রতিবার দুর্ঘটনায় কয়েকটা নাম-চেনা মুখ হারিয়ে যায়, কিছু কান্না শোনা যায়, তারপর আবার সব আগের মতো।
প্রশাসন নীরব, ঘাটের বেপরোয়া চালকরা আগের চেয়েও বেপরোয়া।
আমি আজও ভাবি—মিঠুনের মতো কতজনের জীবন এভাবেই শেষ হয়ে গেছে এই নদীতে!
একটা মা হারায় তার সন্তানকে, একটা শিশু হারায় তার বাবাকে।
রূপসার জলে ডুবে শুধু মানুষ নয়, ডুবে যায় একেকটা সংসারের হাসি, একেকটা জীবনের স্বপ্ন।
এখন রূপসাঘাট মানেই আমার কাছে যন্ত্রণা আর আতঙ্কের অন্য নাম।
প্রতিদিন যখন ট্রলারে উঠি, মনে প্রশ্ন জাগে—
“আজ কি আমি ঘরে ফিরতে পারব?”
আমরা যতদিন না এই মৃত্যুগুলোকে “দুর্ঘটনা” নয়, বরং অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার ফল হিসেবে দেখতে শিখব,
ততদিন রূপসা নদী আমাদের গিলে খেতেই থাকবে—
একটি করে মুখ, একটি করে পরিবার, একটি করে স্বপ্ন।