- by Editor
- Dec, 03, 2025 17:48
সম্পাদকীয় | মতামত
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। মানুষ চেয়েছিল স্বাভাবিক জীবন, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার। সেই জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশার প্রেক্ষাপটেই পরিবর্তনের ডাক উঠে— যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিপ্লব’। মানুষের বিশ্বাস ছিল, এবার হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন সংস্কৃতি আসবে, দুর্নীতি কমবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়েছে— সেই পরিবর্তনের সুফল আসলে কারা ভোগ করছে?
সমালোচকদের অভিযোগ, জনগণের উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে পুঁজি করে একটি অসৎচক্র নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বিপ্লবের আদর্শিক প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতা ও প্রভাবের নতুন সমীকরণ। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান উন্নতি না এলেও কিছু গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে পরিকল্পিত মব সহিংসতার অভিযোগ। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং জনতার নামে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই পরিস্থিতি এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে অতীতের দীর্ঘ অস্থিরতার ঘটনাগুলোও মানুষ ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছে।
২৪-পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট— সংস্কার হবে, বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং মানুষ অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। কিন্তু গত ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে, দৃশ্যমান সাফল্য কোথায়?
জনগণ আজ বড় কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে চায় না; তারা দেখতে চায় বাস্তব ফলাফল। তারা এমন উদাহরণ খুঁজছে, যেটিকে নির্দ্বিধায় “ভালো কাজ” বলা যায়। উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা, বিচার কিংবা প্রশাসনিক সংস্কার— কোনো ক্ষেত্রেই যদি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন স্পষ্ট না হয়, তবে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে আস্থাহীনতায় রূপ নেওয়াই স্বাভাবিক।
অবশ্য এই কথাগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা ও সমালোচনা থাকবে— সেটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু প্রশ্ন তোলার অধিকারও গণতন্ত্রেরই অংশ। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে যায়— বিপ্লব কি জনগণের জন্য হয়েছিল, নাকি কিছু মানুষের জন্য?
রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের হারাতে বসা আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ ইতিহাস বলে, প্রত্যাশা ভেঙে গেলে হতাশা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দেয়।
পরিবর্তনের প্রকৃত সফলতা তখনই প্রমাণিত হবে, যখন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং স্থিতিশীলতার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করবে— শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তবতায়।