আজকের তারিখ: শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৭ সকাল | ২৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সম্পাদকীয়: ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা—সংকটের দায় কার?


সম্পাদকীয়: ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা

—সংকটের দায় কার?

আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা যে দীর্ঘদিন ধরেই নানামুখী সংকটে নিমজ্জিত—তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সম্প্রতি বরগুনার আমতলী উপজেলায় ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। লাগাতার কর্মবিরতি, পরীক্ষাবর্জন, এরপর ১৫২টি সরকারি বিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’—এ যেন শিক্ষার মূল কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যার ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা সকালবেলা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, এবং অভিভাবকদের ক্ষোভে তালা ভাঙার মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

অভিভাবক–প্রধান শিক্ষক–নৈশ প্রহরীর সহায়তায় বিকেলে পরীক্ষা নেওয়া গেলেও এ অবস্থাকে কি আমরা স্বাভাবিক বলতে পারি? শিক্ষা কি কখনো শিক্ষকবিহীন হতে পারে? ৯০৫ জন সহকারী শিক্ষক একযোগে কর্মবিরতিতে গিয়ে বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়, তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি শিক্ষাব্যবস্থার চরম দুর্দশারই প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষকদের ক্ষোভ, অভিভাবকদের হতাশা, শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা

-------------------

হলদিয়া, গুরুদল, চাওড়া, বন্দর মডেল—উপজেলার প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়েই একই ছবি: শিক্ষকের অনুপস্থিতি, গেটে তালা, আর হতাশ অভিভাবকদের ভিড়। যে শিক্ষকরা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব রাখেন, তারাই যখন দাবি আদায়ে অটল থেকে শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরে যান, তখন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য—এই আন্দোলনের মূল্য কি শিশুদের উপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত?

কারণ, এ পরীক্ষাগুলো শুধু কাগজে-কলমের মূল্যায়ন নয়—এগুলো শিশুদের মানসিক প্রস্তুতি, অভ্যাস গঠন এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কথায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার—বার্ষিক পরীক্ষা একটি সিডিউল্ড পরীক্ষা, যার ব্যাঘাত কোনোভাবেই নৈতিকতার আওতায় পড়ে না।

শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা

------------------------

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিকেলে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সকালে ৯৭টি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার দায় কে নেবে? শিক্ষা প্রশাসন কি আগে থেকেই পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে? যদি অভিভাবকদের দিয়ে তালা ভাঙিয়ে পরীক্ষা নিতে হয়—তা হলে শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বশীলতা কোথায়?

সমাজের জন্য বিপজ্জনক বার্তা

-----------------

বর্তমান সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু আমতলীর এই ঘটনা সেই আস্থাহীনতাকে আরও গভীরে নিয়ে গেল। শিক্ষক-প্রশাসন–অভিভাবক তিন পক্ষের সমন্বয়হীনতা এমন এক অবস্থার জন্ম দিয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

এমন নৈরাজ্য আগে কখনো ঘটেনি—এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।


সময়ের দাবি: টেকসই সমাধান

------------------------

শিক্ষকরা দাবি করবেন—এটা স্বাভাবিক।

সরকার দাবি শুনবে—এটাও স্বাভাবিক।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে দাবি আদায়ের চেষ্টা—এটিকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বলা যায় না।

এই সংকট সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোর দ্রুত যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রতিরোধমূলক সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি, যা শিক্ষক–শিক্ষার্থী–অভিভাবক—সব পক্ষকে একই সুরে নিয়ে আসতে পারে।

কারণ দিনের শেষে একটি বিষয়ই সত্য—

শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ভেঙে পড়ে রাষ্ট্রের ভিত।

author

Editor

সম্পাদকীয়: ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা—সংকটের দায় কার?

Please Login to comment in the post!
adds

you may also like